করোনাভাইরাসের নতুন আতঙ্ক ‘ওমিক্রন’, আসলেই কি উদ্বেগজনক?

সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকায় ধরা পরেছে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন ‘ওমিক্রন’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাসের এই ধরণকে ‘উদ্বেগ সৃষ্টিকারী ধরণ’ বা ‘ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন’ নামে ঘোষণা দিয়েছেন। মূলত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২৪শে নভেম্বর, ২০২১ করোনাভাইরাসের এই নতুন ধরণ শনাক্ত হওয়ার খবর জানতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওমিক্রন বারবার জিনগত রূপ বদলাতে সক্ষম এবং নতুন করে আবার সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে অনেক দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে বাংলাদেশের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে।

ওমিক্রনকে উদ্বেগজনক বলার কারণ :
ভাইরাসের এই ধরণকে প্রথমে বি.১.১.৫২৯ নামে নামকরণ করা হলেও পরবর্তীতে নাম দেওয়া হয় ‘ওমিক্রন’। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা(WHO) ওমিক্রনকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। উদ্বেগজনক বলার কারণ হচ্ছে করোনাভাইরাসের এই ধরণটি বারবার জিনগত রূপ বদলাতে সক্ষম এবং আগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে বা আক্রান্ত হয়েছে এমন চিহ্নিত ব্যক্তিদের আবার ওমিক্রনে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে উল্লেখ করেছেন।

ওমিক্রন প্রথম সনাক্ত হওয়ার স্থান :
দক্ষিণ আফ্রিকার গৌতেং প্রদেশে হঠাৎ করোনাভাইরাসের নতুন ধরনের সংক্রমণের আবির্ভাব দেখা যায়। আর এই নতুন ধরনটি হচ্ছে ওমিক্রন। প্রদেশটি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া ও জোহানেসবার্গ নিয়ে গঠিত। করোনাভাইরাসের এই নতুন ধরনটি একাধিকবার তার জিনগত রূপ বদল এবং মানুষের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিতে সক্ষম। মূলত এই দুইটি কারণে এই নতুন ধরনটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

ওমিক্রন এর লক্ষণ সমূহ :
চিকিৎসকদের মতে, ওমিক্রনের কিছু কিছু লক্ষণ সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেকে হাসপাতালে ভর্তি না হওয়ার আগেই সুস্থ হয়ে যাচ্ছে। ওমিক্রন এর লক্ষণ সমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
১. চরম ক্লান্তি
২. গলা ব্যাথা
৩. পেশি ব্যাথা
৪. শুকনো কাশির মতো সমস্যা
চিকিৎসকদের মতে, ইউরোপের অনেকে করোনাভাইরাসের নতুন ধরনে আক্রান্ত এবং আক্রান্তের অধিকাংশ ব্যক্তির বয়স ৪০ বছরের নিচে।

করোনার নতুন ধরণ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন প্রতিরোধে ১৫টি নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নির্দেশনাগুলো হচ্ছে

১. সাউথ আফ্রিকা, নামিবিয়া, জিম্বাবুয়ে, বতসোয়ানা, এসওয়াতিনি, লেসোথো এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক সময় সময় ঘোষিত অন্যান্য আক্রান্ত দেশ থেকে আগত যাত্রীদের বন্দরসমূহে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্ক্রিনিং জোরদার করতে হবে।

২. সব ধরনের (সামাজিক/ রাজনৈতিক/ ধর্মীয়/ অন্যান্য) জনসমাগম নিরুৎসাহিত করতে হবে।

৩. প্রয়োজনে বাইরে গেলে সবাইকে বাড়ির বাইরে সর্বদা সঠিকভাবে নাক-মুখ ঢেকে মাস্ক পড়াসহ সকল স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে।

৪. রেস্তোরাঁতে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা ধারন ক্ষমতার অর্ধেক বা তার কম করতে হবে।

৫. সকল প্রকার জনসমাবেশ, পর্যটন স্থান, বিনোদন কেন্দ্র, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার, সিনেমা হল/ থিয়েটার হল ও সামাজিক অনুষ্ঠানে (বিয়ে, বৌভাত, জন্মদিন, পিকনিক, পার্টি ইত্যাদি) ধারণ ক্ষমতার অর্ধেক বা তার কম সংখ্যক লোক অংশগ্রহণ করতে পারবে।

৬. মসজিদসহ সকল উপাসনালয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে।

৭. গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে।

৮. আক্রান্ত দেশগুলো থেকে আগত যাত্রীদের ১৪ দিন কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে হবে।

৯. সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (সকল মাদ্রাসা, প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়) ও কোচিং সেন্টারে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে।

১০. সকল স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে সেবা গ্রহীতা, সেবা প্রদানকারী ও স্বাস্থ্য কর্মীদের সর্বদা সঠিকভাবে নাক-মুখ ঢেকে মাস্ক পরাসহ সকল স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে।

১১. স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভ্যাকসিন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

১২. করোনা উপসর্গ/লক্ষণযুক্ত সন্দেহজনক ও নিশ্চিত করোনা রোগীর আইসোলেশন ও করোনা পজিটিভ রোগীর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা অন্যান্যদের কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

১৩. কোভিড-১৯ এর লক্ষণযুক্ত ব্যক্তিকে আইসোলেশনে রাখা এবং তার নমুনা পরীক্ষার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে সহায়তা করা যেতে পারে।

১৪. অফিসে প্রবেশ এবং অবস্থানকালীন সময়ে বাধ্যতামূলকভাবে নাক-মুখ ঢেকে মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা দাপ্তরিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

১৫. কোভিড-১৯ রোগ নিয়ন্ত্রণ ও হ্রাস করার নিমিত্তে কমিউনিটি পর্যায়ে মাস্ক পড়াসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সচেতনতা তৈরির জন্য মাইকিং ও প্রচারণা চালানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে মসজিদ/ মন্দির/ গির্জা/ প্যাগোডার মাইক ব্যবহার করা যেতে পারে এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর/ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যসহ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।

এই নির্দেশনাগুলো দেশব্যাপী কঠোরভাবে বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। করোনাভাইরাসের এই নতুন ধরন আবার নতুন করে বিশ্ববাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে। তাই আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করে চলতে হবে এবং করোনাভাইরাসের নতুন ধরন থেকে দূরে থাকতে হবে।

Leave a comment

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More