লাল শাক চাষ পদ্ধতি (টব ও জমি)

লাল শাক চাষ পদ্ধতি খুবই সহজ ও নির্ভেজাল এবং অল্প ব্যয়েই চাষ করা যায়। বর্তমানে লাল শাক হচ্ছে বাংলাদেশের জনপ্রিয় একটি শাক। বড়-ছোট কমবেশি সবাই লাল শাক খেতে পছন্দ করে। এই শাক সর্বত্রই চাষের উপযোগী হওয়ায় সব অঞ্চলেই সহজে পাওয়া যায়। রান্নার পর শাকের রং গাঢ় লাল বর্ণ ধারণ করে।

সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণ সম্পন্ন লাল শাক টব, বাড়ির আঙ্গিনা অথবা জমিতে চাষ করা যায়। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বানিজ্যিকভাবেও লাল শাক চাষ করা হচ্ছে এবং বাজারজাত করা হচ্ছে। বেকার নারী-পুরুষ নিজের জমিতে বা অন্যের জমিতে বর্গা নিয়ে লাল শাক চাষ করে এবং সেগুলো বাজারজাত করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে।
জীবনধারার এবারের আলোচনায় জানবো লাল শাক চাষ পদ্ধতি এবং তার নানাবিধ উপকারিতা সম্পর্কে।

পুষ্টিগুণ : লাল শাকে রয়েছে অধিক পরিমাণে ভিটামিন এ, বি, সি ও ক্যালসিয়াম।

টবে লাল শাক চাষ পদ্ধতি

★ স্থান নির্ধারণ
বাসার বারান্দা অথবা ছাদ যেকোনো জায়গায় টবে চাষ করা যাবে। তবে অবশ্যই আলো-বাতাস সম্পন্ন জায়গা হতে হবে। তাহলে গাছগুলো স্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাবে। তবে ছায়াতেও রাখা যাবে কিন্তু গাছের সাইজ সেরকম হারে বৃদ্ধি পাবে না।

★ টব
লাল শাক চাষের জন্যে মাঝারি সাইজের টব অথব প্লাস্টিকের বালতি নির্বাচন করা যেতে পারে। তবে মাঝারি সাইজের একটি টবে ১৮০-২০০ টি গাছের চাষ করা সম্ভব।

★ মাটি প্রস্তুতি
লাল শাক হচ্ছে বারোমাসি চাষযোগ্য শাক। তাই যেকোনো সময়, যেকোনো মাটিতেই চাষ করা সম্ভব। তবে লাল শাকের জন্য দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি বেশি কার্যকারি। মাটিতে যথেষ্ট পরিমাণ জৈব সার থাকতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু ঝুরঝুরে মাটির এক ভাগ মাটি আর এক ভাগ জৈব সার ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। মাটি শুকনো হলে হালকা পানি দিয়ে ভিজিয়ে নিতে হবে।

★ বীজ রোপণ
কমবেশি সারাবছরই লাল শাক চাষের উপযোগী। তবে শীতের শুরুর দিকে চাষ করলে অন্যান্য সময়ে চাষের তুলনায় ভালো ফলন পাওয়া যায়।

★ যত্ন
প্লাস্টিকের বালতিতে গাছ রোপণ করলে আগে অবশ্যই পানি বের করার জন্য ছোট ছোট ছিদ্র করে নিতে হবে। এবং টবেও রোপণ করলে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রখতে হবে।
বীজ গজানো শুরু হলে প্রতিটি গাছের দূরত্ব ৫সে.মি. রাখতে হবে এবং অতিরিক্ত গাছগুলো তুলে ফেলতে হবে। মাটিতে চটা পড়লে নিরানি দিয়ে ভেঙ্গে ফেলতে হবে এবং মাটির অবস্থা দেখে সেচ দিতে হবে।

★ ফসল তোলা
গাছ গজানোর এক মাসে পরেই ফসল উঠানোর উপযোগী হয়ে যায়। তবে যেগুলো গাছ বেশি বড় সেগুলো আগে উঠাতে হবে। এভাবে দু-তিন দিনে পর্যায়ক্রমে সংগ্রহ করা যাবে।

★ নোটিশ
যেহেতু এটা টবে চাষ পদ্ধতি অর্থাৎ টবে সাধারণত নিজের বাড়ির জন্য চাষ করা হয়, বাণিজ্যিক এর জন্য না তাই পোকা-মাকড় সংক্রমণ বা চিকিৎসা পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়নি। অল্প করে চাষ করার ফলে অসুখ-বিসুখসহ আনুষঙ্গিক সমস্যা দেখা দিলে আবার নতুন করে চাষ করায় উত্তম।

জমিতে লাল শাক চাষ পদ্ধতি

★ চাষের সময়
লাল শাক বারোমাসই চাষের উপযোগী। তবে শীতের শুরুর দিকে অর্থাৎ ভাদ্র থেকে পৌস মাস পর্যন্ত চাষ করলে অন্যান্য সময়ে চাষের তুলনায় ভালো ফলন পাওয়া যায়।

★ জাত
লাল শাকের প্রায় ৬-৭টি জাত রয়েছে। তাদের মধ্যে পিংকি কুইন, রক্তজবা, রক্ত লাল, আল্টা পেটি-২০, বারি লাল শাক-১, ললিতা, রক্তরাঙ্গা অন্যতম। তবে বাংলাদেশে বারি লালশাক-১ এর প্রচলন বেশি হওয়ায় এই জাতের চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

★ বারি লালশাক-১ জাতের বৈশিষ্ট
১. ১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশে বারি লালশাক-১ চাষের অনুমোদন পাই।
২. এই জাতের শাকের পাতের বোটা ও কাণ্ড নরম হয় এবং উজ্জ্বল লাল রঙ ধারণ করে।
৩. প্রতি গাছে ১৫-২০টি পাতা থাকে।
৪. গাছের উচ্চতা আনুমানিক ২৫-৩৫ সে.মি. ও ওজন ১০-১৫ গ্রামের হয়।
৫. বীজ হয় গোলাকার এবং ফুলের রঙ হয় লাল।
৬. বীজের উপরাংশ কালো ও কিছুটা লাল দাগ মিশানো থাকে।

★ মাটির প্রস্তুতি
যেকোনো মাটিতেই লাল শাক চাষ উপযোগী। তবে লাল শাকের জন্য দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটি বেশি কার্যকারি। মাটিতে যথেষ্ট পরিমাণ জৈব সার থাকতে হবে। তবে পানি জমে না এমন জায়গা নির্ধারণ করতে হবে।

★ জমি তৈরি ও বিজ বপন
১. লাল শাক চাষের আগ মূহুর্তে জমি ভালভাবে চাষ ও মই দিয়ে শাক চাষের উপযোগী করে নিতে হবে। জমি ও মাটির অবস্থা বুঝে ৪-৬টি চাষ ও মই দিলেই হবে।
২. বীজ ছিটিয়ে ও বীজ সারিতে রোপণ উভয় ভাবেই করা যায়। তবে সারিতে রোপণ বেশ সুবিধাজনক।
৩. প্রতিটি সারির দূরত্ব অর্থাৎ এক সারি থেকে অন্য সারির দূরত্ব ২০সে.মি. হতে হবে।
৪. চাষ উপযোগী জমিতে একটি কাঠি দিয়ে ১৫-২০ সে.মি. গভীর লাইন টেনে সারিতে বীজগুলো বুনো মাটি সমান করে দিতে হবে।

★সার প্রয়োগ
অভিজ্ঞদের মতে, লাল শাকের গুণগত মানসম্মত ভালো ফলন পেতে হলে জমিতে যতটুকু সম্ভব জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে।

★সারের পরিমাণ

এক শতক জমিতে সার প্রয়োজন :
১. গোবর- ৪০ কেজি
২. ইউরিয়া- ৫০০ গ্রাম
৩. টিএসপি- ৩০০ গ্রাম
৪. এমওপি- ৪০০ গ্রাম

এক হেক্টর জমিতে সার প্রয়োজন :
১. গোবর- ১০ টন
২. ইউরিয়া- ১২৫ কেজি
৩. টিএসপি- ৭৫ কেজি
৪. এমওপি- ১০০ কেজি

★ পরিচর্যা
চারা গজানো শুরু হলে ঘন ঘন জায়গার গাছগুলো তুলে ফেলতে হবে। সেক্ষেত্রে ছিটিয়ে বীজ ফেলে হলে প্রতি বর্গমিটারে ১০০-১৪০ টি গাছ রাখতে হবে এবং সারিতে লাগালে একটি গাছের থেকে আরেকটি গাছের দূরত্ব ৫সে.মি. রাখতে হবে৷ ৪-৫ দিন পর পর সেচ দেওয়া সবচেয়ে ভালো। তবে নিয়মিত জমির আগাছা পরিষ্কার করতে হবে এবং মাটি আলগা করতে হবে।

★ রোগবালাই

শুয়া পোকা :
এই পোকা গাছের পাতা খাই।

প্রতিরোধ :
ম্যালাথিয়ন ৭৫ ইসি, রক্সিয়ন ৪০ ইসি, ইকালাক্স ২৫ ইসি এই ঔষধগুলোর যেকোনো একটি ঔষধের সাথে ১.১ লিটার পানি মিশিয়ে প্রতি হেক্টর জমিতে স্প্রে করতে হবে।

মরিচা রোগ :
গাছের শিকড় বাদে গাছের সব জায়গায় এই রোগে আক্রান্ত হয়। আক্রান্ত গাছের পাতার নিচে সাদা বা হলুদ দাগ দেখা যায়। সেটা পরবর্তীতে লালচে বা মরিচা রং ধারণ করে পাতা মরে যায়।

প্রতিরোধ :
প্রতি লিটার পানিতে ১.৫ গ্রাম ডাইথেন এম-৪৫ ঔষধ মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

★ ফসল সংগ্রহ
গাছ গজানোর ৩০-৪০ দিনের মধ্যে ফসল সংগ্রহের উপযোগী হয়ে যায়। তবে সবগুলো একসাথে না উঠিয়ে ধীরে ধীরে প্রথমে বড়গুলো এভাবে পর্যায়ক্রমে ৩-৪ দিনে উঠানো ভালো।

★ ফলন
প্রতি শতকে ৩০-৪০ কেজি এবং প্রতি হেক্টরে ৫-৬ টন পাওয়া যায়।

লাল শাক বাজারজাত করে বেকারত্ব সমস্যা দূর হবে এবং সংসারে শাকের চাহিদা পূরণ করতে লাল শাক কার্যকরি ভূমিকা রাখবে। তাই লাল শাক চাষ পদ্ধতি জেনে সে অনুযায়ী কাজ করলে ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।

> আরো পড়ুন : আম এর ১৫টি উপকারিতা (কাঁচা ও পাকা)

স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক আরো নিত্যনতুন আপডেট পেতে জয়েন করুন জীবনধারার ফেসবুক গ্রুপ জীবনধারা (সুস্থ্য দেহ, সুস্থ্য মন) এ।

তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট

Leave a comment

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More