মাথা ব্যাথা কেনো হয়? মাথা ব্যাথার ১০টি কারণ ও প্রতিকার

প্রাত্যহিক জীবনে মাথা ব্যাথা খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। কিন্তু খুবই সাধারণ একটি সমস্যা হলেও মাথা ব্যাথার কারণে বড় ধরনের সমস্যাও হতে পারে। সাধারণত টেনশন এবং মাইগ্রেন এর কারণেই মাথা ব্যাথা হয়ে থাকে। তার মধ্যে শতকরা প্রায় ৭০% টেনশনের জন্য এবং ১১% মাইগ্রেন এর জন্য। বাকি ১৯% অন্যান্য কারণে মাথা ব্যাথা হয়ে থাকে। তবে মাথা ব্যাথার ধরণ দেখে বুঝা সম্ভব কেনো এবং কি কারণে হয়েছে। মাথা ব্যাথা সাধারণত ধূমপান, মদ্যপান, গরম আবহাওয়া, ডাক্তারের পরামর্শ ব্যাতিত অতিরিক্ত ঘুমের ঔষধ খাওয়া, অনিয়মিত ঘুম ইত্যাদির কারণে হয়। জীবনধারায় এবার আলোচনা করবো মাথা ব্যাথা হয় এরকম ১০টি কারণ এবং তার প্রতিকার সম্পর্কে।

মাথা ব্যাথার ১০টি কারণ ও প্রতিকার

১/ মাইগ্রেন :
খুবই পরিচিত একটি রোগ হচ্ছে মাইগ্রেন। এটি সাধারণত বংশগত রোগ। নারীরাই বেশি মাইগ্রেন সমস্যায় ভুগেন। এই রোগটি ১৫-১৬ বছর বয়সীদের থেকে শুরু হয়ে ৪০-৫০ বছর বয়স পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

লক্ষণ :
★ মাথার যেকোনো এক পাশে ব্যাথা শুরু হলেও পরেরবার অপর পাশে ব্যাথা আরম্ভ হয়।
★ ব্যাথা আনুমানিক ৪ ঘন্টা থেকে ৭২ ঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
★ মাথার দুই পাশের রগগুলো টানটান করছে বলে মনে হবে।
★ব্যাথার তীব্রতা অধিক হওয়ায় কোনো কাজই ঠিকঠাক ভাবে করা সম্ভব হয়না।
★ আলো বা শব্দের সময় ব্যাথার তীব্রতা বাড়তে থাকে।
★ ব্যাথা শুরুর আগ মূহুর্তে চোখের সামনে আলোর নাচানাচি, আঁকাবাঁকা লাইন দেখা যায়।
★ অন্ধকার রুমে সুয়ে থাকলে ব্যাথার তীব্রতা কমতে থাকে।

চিকিৎসা :
যেসব কারণে মাইগ্রেন এর সমস্যা বাড়তে থাকে সেসব থেকে দূরে থাকতে হবে। তাৎক্ষণিক চিকিৎসার জন্য প্যারাসিটামল এর সাথে প্রোক্লোরপেরাজিন, মেটাক্লোপ্র‍্যামাইড দেওয়া যেতে পারে। মাইগ্রেন এর সমস্যা বেশি হলে সুমাট্রিপটিন দেওয়া যেতে পারে। যেটা মুখ বা ইনজেকশন এর মাধ্যমে দেওয়া যায়। সুমাট্রিপটিন এর মাধ্যমে মাথার বাইরের ধমনীকে সংকুচিত করে। বিকল্প হিসেবে দেওয়া যেতে পারে আর্গোটামিন।
ঘন ঘন আক্রমণ হলে সমাধানের জন্য প্রোপানলোল, পিজোটিফেন, অ্যামিট্রিপটাইলিন খাওয়া যাবে।

মাইগ্রেনসহ বিভিন্ন কারণে মাথা ব্যাথা অনুভূত হলে কুরআনে উল্লেখিত এই দোয়াটি পড়লে ভালো কার্যকরী হয়। দোয়াটি নিম্নরূপ :
لَّا يُصَدَّعُونَ عَنْهَا وَلَا يُنزِفُونَ

বাংলা উচ্চারণ : ‘লা ইউসাদ্দাউনা আনহা ওয়া লা ইয়ুংযিফুন।’ (সুরা ওয়াকিয়া : আয়াত ১৯)

২/ টেনশন বা দুশ্চিন্তা জনিত মাথা ব্যাথা :
এই সমস্যা মাথা ব্যাথার খুব সাধারণ একটি সমস্যা। যেটা জীবনকালের প্রায় ৮০% সময় ধরে থাকে। মানসিক চাপের কারণে মূলত এই সমস্যাটা হয়। নারী-পুরুষ উভয়ের ই টেনশন টাইপ হেডক হয়ে থাকে।

লক্ষণ :
★ দুশ্চিন্তা জনিত মাথা ব্যাথা মাথার উভয় দিকেই হয়।
★ মাথায় চাপ সৃষ্টি হচ্ছে -এমনটা মনে হয়।
★ ব্যাথা কম থেকে মাঝামাঝি হয়ে থাকে, মাইগ্রেন এর মতো সেরকম তীব্র ব্যাথা হয় না।
★ ব্যাথার স্থায়িত্বকাল কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েকদিন পর্যন্ত স্থায়িত্ব হয়।
★ দুশ্চিন্তা, মানসিক বা পারিবারিক কিংবা পেশাগত চাপের কারণে এই সমস্যা সৃষ্টি হয়ে থাকে।

চিকিৎসা :
বেদনা নাশক ঔষধ খেয়ে সমাধান পাওয়া যায়। ব্যাথা অল্প থাকলে ট্র্যাম্কুলাইজারও খাওয়া যেতে পারে।

আরো পড়ুন > পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ লেবুর উপকারিতা

৩/ ক্লাস্টার মাথাব্যাথা :
ক্লাস্টার মাথাব্যথা মাইগ্রেন এর ব্যাথার চেয়ে কম ব্যাথা অনুভূত হয়। এই সমস্যা যেকোনো সময় হতে পারে। সাধারণত বয়স্ক পুরুষরা ক্লাস্টার মাথাব্যথায় আক্রান্ত হয়। এই ব্যাথা মুখমণ্ডলের ভিতর এবং উপরের আশেপাশে এবং চোখের আশেপাশে অনুভূত হয়। এই ব্যাথা শুরু হলে চোখের জল ঝরে, নাক বন্ধ হয়ে আসে এবং অনিদ্রা হয়।

চিকিৎসা :
এই সমস্যার জন্য এন্টিইনফ্লামেটরী দেওয়া যেতে পারে। তাছাড়া সুমাট্রিপটিনও ভালো কাজ করে। রোগ প্রতিরোধে আর্গোটামিন ও ভেরাপামিল কার্যকারি ভূমিকা রাখে। ক্লাস্টার মাথাব্যথা পরিহারে অবশ্যই ধুমপান ও মদ্যপান থেকে দূরে থাকতে হবে।

৪/ সাইনাস মাথাব্যাথা :
ঘন ঘন সর্দি-কাশি যাদের হয় সাধারণত তারাই সাইনাস মাথাব্যথায় ভোগেন। এটি সর্দি-কাশি হওয়ার ফলে সাইনুসাইটিস থেকে এই ব্যথার উৎপত্তি।
সাইনাস মাথাব্যথার ফলে মুখমণ্ডলে বেশি ব্যাথা বা চাপ সৃষ্টি হয়, নাক বন্ধ হয়ে যায়, সাইনাস এবং সাথে মাথাব্যাথা। সাধারণত ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া দ্ধারাই এই সমস্যা সৃষ্টি হয়। এ সময় নাক বন্ধ হয়ে যায়, ঘন ঘন সর্দি পড়ে, নাক দিয়ে গন্ধ পাওয়া যায় না।

চিকিৎসা :
এন্টিবায়োটিক খেলে এক সপ্তাহের মধ্যে এই সমস্যা ভালো হয়ে যায়। সাথে এন্টিহিস্টামিন, নাজাল ডিকনেজস্ট্যান্ট খাওয়া যেতে পারে।

৫/ বজ্রপাত এর মতো মাথাব্যাথা :
এই ধরনের মাথাব্যাথা শুরু হয় বজ্রপাতের মতো হঠাৎ হঠাৎ বা ধীরে ধীরে। ব্যাথা মুখ্য বা গৌণ দুই ভাবেই হতে পারে। তবে গৌণ ব্যাথার ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণ, মস্তিষ্কের চাপ কমে যাওয়া এবং রক্ত-চাপ বৃদ্ধি পাওয়া ইত্যাদি।

৬/ প্রতিদিনের মাথাব্যাথা :
কোনো কারণ ছাড়াই প্রতিদিন মাথাব্যাথা হয়, যেটা মাইগ্রেন বা টেনশন এর মতোই মাথাব্যাথা অনূভুত হয়। টানা ৩মাস বা তার বেশি সময় ধরে এই ব্যাথা স্থায়ী হলেই এর সমস্যা নির্ণয় করা যায়।

৭/ হেমিক্র‍্যানিয়া কনটিনিউয়া :
হেমিক্র‍্যানিয়া কনটিনিউয়া হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিদিনের রোগ। এই রোগের জন্য মাথার একদিকে ব্যাথা অনুভূত হয় এবং মাঝারি ব্যাথা হয়। এই সমস্যার কারনে চোখ লাল হয়ে যায়, নাক বন্ধ হয়ে যায়। ক্লাস্টার মাথাব্যাথার মতোই কিছুটা পরিলক্ষিত হয়।

৮/ গৌণ মাথাব্যাথা :
যখন কোনো মাথা ব্যাথার কোনো প্রধান কারণ থাকে না সেটাই গৌণ মাথাব্যাথা। কিন্তু এই ব্যাথা আবার দিনকে দিন বাড়তেই থাকে। যেটা একসময় ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। তাই এই ব্যাথার অন্তর্নিহিত কোনো সমস্যা আছে কি না সেটা পরিক্ষা করতে হবে।
গৌণ মাথাব্যাথার কোনো কারণ থাকে না।

৯/ চক্ষু জনিত মাথাব্যাথা :
মাথা ব্যাথার প্রায় ৫% মাথা ব্যাথা হচ্ছে চক্ষু জনিত মাথা ব্যাথা। অনেকক্ষণ ধরে পড়াশোনার করা, সেলাই করা, সিনেমা-নাটক দেখার ফলে এ ব্যাথা অনুভূত হয়।
তাছাড়া আমরা সাধারণত অধিকাংশ সময় মোবাইল অথবা কম্পিউটার এর স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি। যার ফলেও মাথা ব্যাথা হয়ে থাকে। তাছাড়া চোখের বিভিন্ন রোগ যেমন : কর্ণিয়া, আইরিশের প্রদাহ, গ্লুকোমা ইত্যাদির কারণেও হতে পারে মাথাব্যাথা। চক্ষু জনিত মাথাব্যাথার ফলে চোখে, কপালের দু-পাশে বা মাথার পিছনে ব্যাথা অনুভূত হয়।
এই সমস্যার জন্য চক্ষু বিশেষজ্ঞ এর কাছে শরণাপন্ন হওয়ায় ভালো।

১০/ হরমনজনিত মাথাব্যাথা :
মহিলাদের মাসিক চলাকালীন দুইটি হরমোন যথাক্রমে প্রোজেষ্ট্রেরন ও এস্ট্রোজেন হরমোন এর আপ-ডাউন হওয়ার ফলে অথবা জন্মনিরোধক বড়ি খেলেও মাথা ব্যাথা হতে পারে।
তবে মাসিক শেষ হলে, জন্মনিরোধক বড়ি খাওয়া শেষ হলে এ ধরনের মাথা ব্যাথা ঠিক হয়ে যায়।

আর নিত্যনতুন স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক আপডেট পেতে জয়েন করুন জীবনধারা(সুস্থ্য দেহ, সুস্থ্য মন) গ্রুপে।
Show Comments (2)

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More