ক্যান্সার কেন হয়? ক্যান্সারের লক্ষণ ও প্রতিকার

ক্যান্সারকে মরণব্যাধি রোগ বলা হলেও বিভিন্ন বিষয়ে সতর্ক থাকলে এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এইজন্য প্রাথমিক পর্যায়েই এই রোগ সনাক্ত করতে হবে এবং তৎক্ষনাৎ চিকিৎসকের কাছে শরণাপন্ন হতে হবে। নয়তো এই রোগ শরীরে বাসা বেধে নিলে সেটা নিরাময় দুষ্কর হয়ে পরে। তাই ক্যান্সার কি, কি কি কারণে ক্যান্সার হয় এবং ক্যান্সারের লক্ষণ যেনে সেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

যেসব কারণে ক্যান্সার হয় :
ঠিক কি কারণে ক্যান্সার হয় সেটা সুস্পষ্টভাবে জানা না গেলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা ক্যান্সার হওয়ার জন্য কিছু কিছু বিষয়কে দায়ী করেছেন। সেগুলো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হলো :

• বংশগত বা জেনেটিক :
পূর্বপুরুষদের অর্থাৎ বাবা-মা, দাদা-দাদি, খালা-ফুফুদের মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী থাকলে তাদের সন্তানদের বা পরবর্তী প্রজন্মের এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই রোগের মধ্যে ব্রেস্ট ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার অন্যতম।

• ধূমপান :
ধূমপানকে মানব শরীরের নীরব ঘাতক বলা হয়। ধূমপানের কারণে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার হয়ে থাকে তবে এগুলোর মধ্যে ফুসফুস ক্যান্সার অন্যতম।

• পান ও গুল :
ওরাল ক্যান্সার বা জিহ্বা ক্যান্সার হওয়ার অন্যতম কারণ জর্দা দিয়ে পান খাওয়া এবং গুল খাওয়া।

• রেডিয়েশন :
অধিকমাত্রায় নির্গত রেডিয়েশন অথবা সূর্যের রশ্মির জন্য ত্বকের ক্যান্সার হয়।
যেমন, জাপানের নাগাসাকির পারমাণবিক বিস্ফোরণের অনেক বছর হয়ে গেলেও এখনো সেই যায়গায় অনেকেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে।

• ক্রনিক ইনফেকশন :
জরায়ু ও বোনের ক্যান্সারের জন্য জরায়ুর সার্ভিক্স এবং বোনের ক্রনিক ইনফেকশন ই দায়ী। তাই সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

তাছাড়া খাদ্যের পচন রোধে ব্যাবহৃত ফরমালিন এর ফলে পাকস্থলী ক্যান্সার এবং চুলে কলব ব্যাবহার করার ফলে ত্বক/স্ক্রিন ক্যান্সার হয়।

ক্যান্সারের লক্ষণ

স্বাস্থ্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক একটি ওয়েবসাইটে ক্যান্সারের লক্ষণ প্রকাশ করে। আর সেগুলো মানব শরীরে দেখা দিলে ভীত না হয়ে চিকিৎসকের কাছে শরণাপন্ন হওয়ার জন্য বলে। জীবনধারায় সেসব লক্ষণগুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে।

★ দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি :
দীর্ঘ সময় ধরে ক্লান্ত মনে হলে অথবা স্বাভাবিক ক্লান্তির চেয়ে অধিক ক্লান্তি মনে হলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
এরকম সমস্যার কারণে মলাশয় ক্যান্সার বা রক্ত ক্যান্সার হয়ে থাকে।

★ হঠাৎ ওজন হ্রাস :
অনেক সময় দেখা যায় হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই ওজন কমতে শুরু করছে। এমন পরিস্থিতিতে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কারণ কিছু কিছু ক্যান্সার রয়েছে যেগুলোতে হঠাৎ ওজন কমিয়ে দেই।
তাই ওজনের দিকে খেয়াল রাখতে হবে এবং প্রাথমিক পর্যায়েই যদি ক্যান্সার শনাক্ত করা যায় তাহলে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তুলা সম্ভব।

★ অনেকদিনের ব্যাথা :
শরীরের কোথাও জখম বা আঘাত ছাড়াই যদি দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাথা অনুভূত হয় এবং ব্যাথার ঔষধ খেয়েও যদি ব্যাথা না সারে তবে অবশ্যই একজন ভালো চিকিৎসকের কাছে শরণাপন্ন হতে হবে। কারণ শরীরের কোন জায়গায় ব্যাথা করছে সেটার উপর নির্ভর করে ব্রেন টিউমার নাকি ডিম্বাশয় নাকি পায়ুপথ ক্যান্সারে আক্রান্ত সেটা নির্ণয় করা যায়।

★ ঘনঘন জ্বর :
ক্যান্সার একবার বাসা বাধলে শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেই৷ যার ফলে ঘনঘন জ্বর হতে থাকে। তবে লক্ষ্য করা যায়, কিছু কিছু ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ের লক্ষণ ই হচ্ছে ঘনঘন জ্বর।
তবে ব্লাড ক্যান্সারে প্রাথমিক পর্যায়েই শরীরে ঘনঘন জ্বর দেখা যায়।

★ ত্বকের অস্বাভাবিক পরিবর্তন :
ত্বকের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলেই ত্বকের ক্যান্সার শনাক্ত করা যায়। এজন্য ত্বকে অতিরিক্ত তিল বা আঁচিল থাকলে অবশ্যই সেগুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। যদি হঠাৎ তিল বা আঁচিলের রং এবং আকারের অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় তবে অবশ্যই একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
ত্বক লালচে হওয়া, ফুসকুড়ি হওয়া এবং রক্তক্ষরণ অন্যান্য ক্যান্সারের লক্ষণ।

★ অস্বাভাবিক হারে মল-মুত্র ত্যাগ :
যদি মল-মুত্র ত্যাগের জন্য ঘনঘন চাপ সৃষ্টি হয় তাহলে ক্যান্সারের সম্ভাবনা থাকে। কারণ ডায়রিয়া, কোষ্ঠ্যকাঠিন্য হচ্ছে মলাশয় ক্যান্সারের লক্ষণ। তাছাড়া মূত্র ত্যাগের সময় অন্ত্রে ব্যাথা অনুভূত বা রক্তক্ষরণ মুত্রথলি ক্যান্সারের অন্যতম কারণ।

★ অকারণে রক্তক্ষরণ :
ক্যান্সারের বড় লক্ষণগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে কাশির সময় রক্তক্ষরণ। এছাড়াও মলদ্বার থেকে রক্তক্ষরণও ক্যান্সারের লক্ষণ।

★ বদহজম :
অনেকেরই খাবার খাওয়ার সময় নিয়মিত বদহজম হতে দেখা যায়, তবে বদহজমের জন্য পেট, কণ্ঠনালি অথবা গলার ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
কিন্তু বদহজম বড় ধরনের লক্ষণ না হলেও কোনো সমস্যা হলে অবশ্যই সেটা এড়িয়ে না যেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

ক্যন্সার সম্পর্কিত কিছু কথা :
উপরে উল্লেখিত লক্ষণগুলোকে ক্যান্সারের সাধারণ লক্ষণ বলা হলেও এর বাইরে আরো কিছু লক্ষণ রয়েছে। তার মধ্যে পা ফুলে যাওয়া, শরীরের আকারের অস্বাভাবিক পরিবর্তন অন্যতম।
আসল কথা হচ্ছে, ক্যান্সারের অনেক কারণ সহজে বুঝা যায় না। আবার একটা ক্যান্সারের চিকিৎসা দিতে গেলে অন্য ক্যান্সার বাসা বাধে। তাই অসুস্থ হলেই হেলাফেলা না করে গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
৩০-৪০ বছর বয়সে পদার্পণ করলে অবশ্যই ৬ মাস পরপর অথবা ১ বছর পরপর স্বাস্থ্য পরিক্ষা করতে হবে।
তাছাড়া প্রাথমিক পর্যায়েই ক্যান্সার শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার ফলে সুস্থ্য হওয়া সম্ভব।

ক্যন্সার রোগীদের জন্য পরামর্শ :
রেডিও থেরাপি বা ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ফলে ক্যান্সার রোগীদের খাদ্যগ্রহনে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হতে পারে। সেগুলোর মধ্যে ক্ষাধামান্দা, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া, পেট ব্যাথা, পেটে গ্যাস জমে পেট ফুলে যাওয়া, খাদ্যের স্বাদ এবং গন্ধ কমে যাওয়া, বমি বমি ভাব, মুখে ঘা, গলা ব্যাথা ও ফুলে যাওয়া, অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস অন্যতম।
আর এই সমস্যা দূরীকরণে খাবার খাওয়ার ২-৩ ঘন্টা আগে ও পরে কেমোথেরাপি দেওয়া বন্ধ রাখতে হবে।
তাছাড়া আরো কিছু নিয়মাবলি আছে যেগুলো মেনে চললে ক্যান্সার রোগীদের সুস্থ্য থাকা যায়।

• জরায়ু, ব্রেস্ট, প্রোস্টেট এবং কোলন ক্যান্সারের রোগীদের চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে। এছাড়াও গলব্লাডার ও এন্ড্রমেট্রিয়াম ক্যান্সার রোগীদের ক্যালরিযুক্ত খাবার পরিহার করতে হবে। তবে আঁশযুক্ত খাবার ক্যান্সার প্রতিরোধ করে তাই নিয়মিত আঁশযুক্ত খাবার খেলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

• পাকস্থলী ও খাদ্যনালী ক্যান্সার প্রতিরোধে খাওয়া যেতে পারে ভিটামিন- সি যুক্ত খাবার।

• ফুসফুস, ব্লাডার ও গলনালী ক্যান্সার প্রতিরোধে ভিটামিন- এ যুক্ত খাবার খেতে হবে। তাছাড়া ফল ও সবজিতে ক্যান্সার প্রতিরোধী অনেক উপদান রয়েছে। ডালজাতীয় খাবার মসুর ডাল, শুকনো সিমের বিচিও ক্যান্সার প্রতিরোধী।

• প্রচুর পরিমাণে তরল জাতীয় খাবার খাওয়া। তবে খাদ্য গ্রহণের মাঝে তরল পানীয় কম পান করা। খাবার খাওয়ার ৩০মিনিট আগে এবং পরে পানি পান করা।

• বেশি বেশি আঁশযুক্ত খাবার যেমন শুকনো ফল, মটরশুঁটি, সিমের বিচি এবং শস্য জাতীয় খাদ্য খেতে হবে।
ডায়রিয়া হলে সোডিয়াম ও পটাসিয়ামযুক্ত তরল খাবার খেলে উপকৃত হতে পারে।

• মুখ শুকিয়ে গেলে চুইংগাম মুখে রেখে চিবানো এবং বমিবমি ভাব হলে খুব গরম বা খুব ঠান্ডা খাবার না খাওয়া।

• মুখে ঘা থাকলে টকজাতীয় ফল, মশলাযুক্ত খাবার, লবণাক্ত খাবার এবং শক্ত খাবার পরিহার করা।
তাছাড়া মুখে ঘা থাকলে দিনে ৩-৪ বার কুলি করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

মানবজীবনে যত জটিল ও কঠিন রোগ আছে তার মধ্যে ক্যান্সার অন্যতম। ধর্মীর রীতিনীতি মেনে চলাফেরা করলে এবং সবসময় পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতা থাকলে এই রোগ থেকে দূরে থাকা যায়। তবে শরীরে ক্যান্সার ধরা পরার প্রাথমিক পর্যায়ে যদি চিকিৎসা দেওয়া হয় তাহলে সুস্থ্য হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাই ক্যান্সারের লক্ষণ জেনে সে অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে।
যদি প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগ সারানো সম্ভব না হলে পরবর্তীতে জটিল আকার ধারণ করতে পারে এবং প্রাণনাশের আশংকাও থাকে।

আরো পড়ুন : ঘরোয়া পদ্ধতিতে ত্বকের এলার্জি দূর করার উপায়

স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক আরো নিত্যনতুন আপডেট পেতে জয়েন করুন জীবনধারার ফেসবুক গ্রুপ জীবনধারা (সুস্থ্য দেহ, সুস্থ্য মন) এ।

Show Comments (2)

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More